ঈদে মিলাদুন্নবীর - না জানা কথা


সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিম, যথেস্ট ধর্মীয় আবেগ অনুভুতি এবং বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঈদে মিলাদুন্নবী উৎযাপন করে। এই দিনে, বেশ কিছু মুসলিম প্রধান দেশে, সরকারি ছুটি থাকে। নামেও ঈদ, কাজেও ঈদ। একেবারে আনন্দে ভরপুর। শুধু আনন্দ নয়, বেশ কিছু ধর্মপ্রান মুসলিম, বিভিন্ন ধরনের ইবাদত করে। কেউ রোজা রাখে, কেউ নামাজ পড়ে। কেউ বিশেষ দোয়া করে। কোথাও আবার এই উপলক্ষে ওয়াজ মাহফিল হয়। জ্বালাময়ী বক্তারা নবীর (স) আদর্শ বর্ননা করেন ; ঈদে মিলাদুন্নবীর ইবাদতের সাওয়াব বর্ননা করেন। সত্যই, বিশ্বব্যাপী এক বিশাল আয়োজন। 

বিভিন্নভাবে এসব আয়োজনে অংশ নিলেও ; বেশীরভাগ মানুষই বলতে পারবে না - ঈদে মিলাদুন্নবী আসলে কি জিনিস?
আরবী মিলাদ (ميلاد) কথাটির অর্থ - জন্মদিন। হ্যাঁ, ওই যে কেক কেটে, গান গেয়ে উতসব করে, সেই জন্মদিন। মিলাদুন্নবী কথাটির অর্থ - নবীর জন্মদিন। এমন জন্মদিন পালন করা মানুষদের দাবী অনুসারে, নবী (স) ১২-রবিউল আওয়াল তারিখে জন্মেছিলেন। আবার উনার মৃত্যুর তারিখও ১২-রবিউল আওয়াল। 

তাদের তথ্য মতে, একই তারিখে নবীর জন্ম ও মৃত্যু। অথচ, তারা জন্মের উতসব পালন করে ; কিন্তু, মৃত্যুর দুঃখ পালন করে না !! 
যাই হোক, এই দিনটি পালন করে ; বিভিন্ন ধরনের ইবাদত করে, কতখানি সওয়াব হয় ; সেই বাপারে পরে বলছি। প্রথমে, নবীর (স) জন্মের তারিখের ব্যাপারে জেনে নেই -

আপনি কি আপনার দাদার বাবার জন্মের তারিখ জানেন? আপনার দাদার জন্মের তারিখ জানেন? কখনো ৭০+ বয়সের কাউকে, তার জন্ম তারিখ জিজ্ঞাসা করে দেখেছেন? তারা কি কেউ জন্ম তারিখ জানে?  

একশো বছর, বা তার আগের যুগের মানুষেরা জন্ম তারিখ মনে রাখতো না। তারা এসব পালন করতো না। আজকের দিনে, পালন না করলেও, সবাই তার জন্ম তারিখ জানতে হয়। কারন, পরিচয়পত্র, বিভিন্ন ধরনের রেজিস্ট্রেশন, সার্টিফিকেট, ইত্যাদিতে জন্ম তারিখ লেখা থাকে। আগের যুগের মানুষে এসব ছিলো না। জন্ম তারিখটা জেনে রাখার বা মনে রাখার কোন প্রয়োজনীয়তা ছিলো না। 
  • তাজমহল নির্মাতা মোঘল বাদশাহ শাহজাহান, ৫ জানুয়ারি, ১৫৯২ তারিখে জন্মেছিলেন

মাত্র ৭০ বছর আগে জন্মানো আপনার দাদার জন্ম তারিখ খুঁজে পাওয়া যায় না। ওদিকে, ৪০০ বছর আগের মানুষ, বাদশাহ শাহজাহানের জন্ম তারিখ জানা যায় কিভাবে?

কারন, শাহজাহান রাজপুত্র ছিলেন। তার জন্মের সময়, উতসব হয়েছে, খবর ছড়িয়ে গেছে। ইতিহাসের পাতায় সেই তারিখগুলো লেখা হয়েছে। আপনার দাদা কোন রাজপুত্র ছিলেন না। কেউ তার জন্মদিন মনে রাখেনি। 

নবীর (স) জন্মের আগেই তার বাবা মারা গিয়েছিলো। তার মা তেমন কোন ধনী ছিলেন না। নবী (স) ছিলেন সুবিধাবঞ্চিত একজন এতিম শিশু। দেড় হাজার বছর আগের যুগে, তেমন একজন সাধারন এতিম শিশুর জন্ম তারিখ জেনে রাখার বা মনে রাখার কোন প্রয়োজনীয়তা ছিলো না। আমার ধারনা, নবী (স) হয়তো নিজেই তার জন্ম তারিখ জানতেন না। তাছাড়া, জন্ম তারিখ কোন কাজেও লাগতো না। 

এবার নবী (স) এর মৃত্যুর সময়ের ব্যাপারে চিন্তা করুন। মৃত্যুর সময়, তিনি ছিলেন দেশ বিজয় করা নেতা। দেশে সবাই তাকে চিনতো। তিনি ছিলেন বিখ্যাত। তাই, তার মৃত্যুর দিনটি মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। ইতিহাসের পাতায়, সেই তারিখ লেখা আছে।

আসলে, ১২ই রবিউল আওয়াল, নবীর মৃত্যুর তারিখ। তার জন্ম তারিখ অজানা রয়ে গেছে। 

কি বুঝলেন?

নবীর (স) জন্ম তারিখ অজানা। অথচ, আমরা আবেগী হয়ে, নবীর মৃত্যু-দিবসে, তার জন্মদিন পালন করি।  শুধু তাই নয়, এই দিনে ইবাদতের ব্যাপারে, হুজুরদের মধ্যে দুটি দল আছে। একদল বলে, এই দিনের ইবাদতে কোটি কোটি সওয়াব হয়। আরেক দল বলে, এই ধরনের ইবাদত করাটা বিদাআত। 

মানুষ কোনটা করবে? কোন পথে যাবে?

  • প্রথমে, বিদাআত জিনিসটা বুঝতে হবে। বিদাআত হলো এমন কোন কাজ, যেটা ইবাদত মনে করে করা হয়, কিন্তু তেমন ইবাদত ইসলামে নেই। এক কথায়, বিদাআত হলো - ভুয়া ইবাদত।       

আমাদের প্রচলিত মিলাদুন্নবী ইবাদতটা আসল নাকি ভুয়া? সেটা বোঝার জন্য, নবী (স) ও তার সাহাবীদের কার্জকলাপ দেখুন। ইসলামে যদি মিলাদুন্নবী অর্থাৎ নবীর জন্মদিন পালন করার নিয়ম থাকতো, তাহলে নবী (স) অন্তত একবার তার সাহাবীদের সাথে নিয়ে, এমন জন্মদিন পালন করতেন। এটা যদি সত্যই সওয়াবের কাজ হতো, তাহলে নবী (স) সেই সওয়াব থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত করতেন না। নবী (স) নিশ্চয়ই আমাদেরকে সেই সওয়াবের কাজ শিখিয়ে দিতেন। 

অন্ধ অনুকরন করবেন না। বড় হুজুর যেটা করে, সেটা ইসলাম নয়। ইসলাম হলো সেটা, যা কোরআনে ও হাদিসে আছে। কোরআন ও হাদিসে নবীর জন্মদিন পালনের নির্দেশ নেই।

দ্রষ্টব্যঃ নিজের জন্ম তারিখ না জানলেও, নবী (স) জানতেন, তিনি কোন এক সোমবারে জন্মেছিলেন। তার জন্মের জন্য শুকরিয়া জানাতে, নবী (স) সোমবার রোজা থাকতেন। আপনি যদি সত্যই নবীর জন্মদিন পালন করতে চান, তাহলে নবীর (স) দেখানো উপায়ে করুন।  ১২ই রবিউল আওয়াল তারিখে নয় ; যে কোন সোমবার রোজা থাকুন। পারলে, প্রতি সোমবার রোজা থাকুন। মাত্র একদিন না করে, সারা বছর ধরে, নবীর জন্মদিন পালন করুন। সারা বছর ধরে সওয়াব নিতে থাকুন।      

Comments