জনতার অধঃপতন


সেই ১৯৭২ সালের ঘটনা। স্থান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিছু দুষ্কৃতিকারী, একটি রাজনৈতিক দলের অফিসে ঢুকে, কিছু গোপন ফাইলপত্র চুরি করে। সেটার তদন্ত হয়, কয়েকজন ধরা পড়ে। সেই তদন্ত করতে করতে, বছরখানিক পরে বের হয়, সেই ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন - তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন। 

এরপর, নিক্সন সেটা ধামাচাপা দেবার চেস্টা করেছেন। দেশের গোয়েন্দা সংস্থাকে হাত করে, অভিযোগ থেকে এড়িয়ে যেতে চেস্টা করেছেন। অবশেষে, শেষ রক্ষা হয়নি। প্রেসিডেন্টের কথাবার্তা ও ফোনালাপের কিছু অডিও পাওয়া গিয়েছিলো। সেগুলোতে মুটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায় - প্রেসিডেন্ট ওই ফাইলপত্র চুরির ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন। অবস্থা আরও খারাপ হয়, যখন সেই অডিও রেকর্ড জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। প্রবল জনরোষের কারনে, প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭৪ সালে পদত্যাগ করেছিলেন।  

ঘটনাটি বুঝেছেন তো?

যখন চুরির ঘটনাটা ঘটেছিলো, নিক্সন তখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন না। তিনি ছিলেন সাধারন একজন নেতা। তার দলের লোকজন, তারই নির্দেশে প্রতিপক্ষ দলের ফাইলপত্র চুরি করেছিলো। বছর-খানেক আগের, সেই সামান্য অপরাধের কারনে, প্রেসিডেন্ট হয়েও তিনি রেহাই পান নাই। সারা দেশের জনগণ এমনভাবে ফুসে উঠেছিলো যে, নিক্সন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।    

সেই ঘটনায়, প্রবল জনরোষের কারন কি? আমেরিকার জনগণ ওভাবে ফুসে উঠেছিলো কেন? 

  • কারন, ৫০ বছর আগের সেই যুগে, মানুষ ছিলো সৎ, সত্যবাদী ও নিরীহ ভালো-মানুষ। সেই সৎ ও সত্যবাদী জনগণ, চুরির নির্দেশদাতাকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে মেনে নিতে পারেনি। 

আরেকটু কাছে আসি। ১৯৯৫ সাল ; সেই যুক্তরাস্ট্র। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের (৫২) সাথে তার সেক্রেটারি মনিকা লিউনেস্কির (২২) অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে, আমেরিকায় তোলপাড় শুরু হয়। এটা কি সত্য, নাকি সাজানো ঘটনা, সেটা নিয়ে এখনো বিতর্ক চলে। আমেরিকার মিডিয়াতে সারাদিন এই ঘটনা দেখাতে দেখাতে, সারা বিশ্বব্যাপী লোকজন এই ঘটনা জেনে গিয়েছিলো। আমেরিকার কথা বাদই দিলাম ; আমাদের বাংলাদেশেই, ক্লিনটনের বিরুদ্ধে মিছিল হয়েছে ; তার ক্রশ পুত্তলিকা, আগুনে পোড়ানো হয়েছে !! 

ক্লিনটন পদত্যাগ করেনি। তবে, তার বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে। দীর্ঘ তিন বছর পরে, ১৯৯৮ সালে, ক্লিনটনকে  সেই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এবং এরপর তিনি দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী হতে পেরেছিলেন। অভিযোগ থেকে অব্যাহতি না পেলে, দ্বীতিয়বার প্রেসিডেন্ট হবার সুযোগ ছিলো না। উল্লেখ্য, ক্লিনটনের কেলেঙ্কারী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লেও, তার নিজের পারিবারিক জীবনে সেটার তেমন একটা প্রভাব দেখা যায়নি। কেলেঙ্কারী, অভিযোগ ইত্যাদির সময়ে, স্ত্রী হিলারির সাথে তার সম্পর্ক স্বাভাবিক দেখা গেছে।   

ক্লিনটনের ঘটনায়  প্রবল জনরোষের কারন কি? আমেরিকার জনগণ ওভাবে ফুসে উঠেছিলো কেন?    

  • কারন, ৩০ বছর আগের যুগে, মানুষের মধ্যে সততা ও সত্যবাদী ইত্যাদি তখনো অবশিষ্ট ছিলো। অবাধ মেলামেশার দেশ হলেও, অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করা মানুষকে, প্রেসিডেন্ট হিসাবে মেনে নিতে পারেনি।
এবার, বর্তমান দেখুন। ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬, এই কয়েক মাসে এপস্টাইন ফাইল প্রকাশ হয়েছে। এটা ছোট-খাটো কোন ফাইল নয়।  ৩০ লক্ষেরও বেশী পৃষ্ঠা। আছে লক্ষ ছবি ও ভিডিও। একটি বিশেষ চক্র, গোপন একটি দ্বীপে, যে কার্যকলাপ করেছে ; সেগুলো কোন মানুষের কাজ নয়। শুধু একটা কথা বলবো - মেয়ে শিশুদের ধর্ষন করে, হত্যা করে, তাদের রক্ত পান করেছে। এই বিশেষ গোপন চক্রটি শয়তানের পুজা করে  ;শয়তানের মতন কাজ করে। বিশ্বের প্রায় সকল ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষ আছে, সেই চক্রে। 

যাই হোক, এপ্সটাইন ফাইলে, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম আছে ; তার অপকর্মের বর্ননা আছে। এমনকি, প্রমান স্বরূপ, ছবিও আছে। তবুও ট্রাম্পের নামে সরকারীভাবে কোন অভিযোগ উত্থাপন হয়নি। এমনকি, আমেরিকার জনগণও এই ব্যাপারে তেমন কোন প্রতিবাদ বা ক্ষোভ প্রকাশ করেনি। 

ট্রাম্পের ঘটনায় জনগনের নিরবতার কারন কি? আমেরিকার জনগণ এতে ক্ষোভ প্রকাশ করলো না কেন?    
  • বর্তমান যুগে মানুষের মধ্যে সততা ও সত্যবাদীতা ইত্যাদি একটুও অবশিষ্ট নেই। বর্তমান যুগের জনগণ মেনে নিয়েছে - "আমরা সবাই খারাপ মানুষ ; নেতা হলো সবচেয়ে খারাপ"। 
তাই আগের যুগে, নেতা অসৎ বা চরিত্র খারাপ হলেই, জনগণ ক্ষোভ প্রকাশ করতো ; প্রতিবাদ করতো। আর বর্তমান - নেতা জানোয়ার হলেও ক্ষোভ প্রকাশ করে না। বরং খুশি হয়ে, মনে মনে বলে - এই তো জানোয়ার পাওয়া গেছে ; এটা আমাদের যোগ্য নেতা হতে পারবে। 

এই ব্যাপারটা  নবীর (স) ভবিষ্যতবাণীর সাথে মিলে যায়। 
  • কিয়ামতের অন্যতম আলামত হিসেবে উল্লেখ করে নবী (সা) বলেছেন -, "যখন কোনো গোত্র বা জাতির নেতৃত্ব দেবে তাদের মধ্যকার সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি (فَاسِقُهُمْ বা أَراذِلُهُمْ)।" আত-তিরমিজি (হাদিস নম্বর: ২২১১)।
      

Comments