কোরআন কি আল্লাহর কথা নাকি সৃষ্টি ?


এই প্রশ্নটির পুঁথিগত উত্তর হলো - কোরআন আল্লাহর "সৃষ্টি" নাকি আল্লাহর "কথা", এই বিষয়ে আলেমদের মতভেদ আছে। তবে, বেশিরভাগ আলমের মত - কোরআন আল্লাহর "কথা"। এমনকি, যারা কোরআনকে আল্লাহর "সৃষ্টি" বলে, তাদেরকে পথভ্রষ্ট বলা হয়েছে।

  • এবার, আমার উত্তর - কোরআন, কোন "কথা" অথবা "সৃষ্টি" নয়। কোরআন হলো আল্লাহর পাঠানো বার্তা/আদেশ।

আমার উত্তরে হয়তো বিতর্ক করার উপাদান খুঁজে পাচ্ছেন না। কিন্তু, বিষয়টা ভালোভাবে বুঝিয়ে বললে, বিতর্ক হতেও পারে।

ভাষা: এই ভাষা জিনিসটা কি? আমি মুখ দিয়ে কিছু শব্দ করি। সেই শব্দ শুনে আপনি আমার মনের ভাব বুঝে নেন। এমন শব্দ করে মনের ভাব বোঝানো লাগে কেন? কারণ, আপনি আমার মনের ভাব জানেন না। সেটা জানা সম্ভব নয়। আমি মুখ দিয়ে শব্দ করবো, আপনি কান দিয়ে শুনবেন। তারপরে আপনি মনের ভাব বুঝবেন। যারা ভালো দেখতে পায় না, তারা চশমা পরে। এই চশমাটা তার একটি disability, একটি সীমাবদ্ধতা। ঠিক তেমনই, ভাষা জিনিসটা আপনার একটা disability, একটি সীমাবদ্ধতা। আপনি আমার মনের ভাব জানেন না, এজন্যই ভাষার সাহায্য নিতে হয়।

  • আল্লাহ সকল সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত। আল্লাহ আপনার মনের ভাব জানেন। কোন শব্দ ছাড়াই, আপনার মনে তথ্য পৌঁছে দিতে পারেন। আল্লাহর যেমন আহার, নিদ্রা লাগে না। ঠিক তেমনই, আল্লাহর কোন ভাষা লাগে না।

আদেশ: এই কথাটার অর্থ, ক্ষমতাশালী কেউ একটি তথ্য দিয়েছে, যে আপনাকে ওই কাজটি করতে হবে। পার্কে একটি সাইনবোর্ড আছে "ফুল ছেঁড়া নিষেধ - আদেশক্রমে কর্তৃপক্ষ"। এই লেখাটি দেখে আপনি কি এমন বোঝেন যে, "ফুল ছেঁড়া নিষেধ", হুবহু এই কথাটা কর্তৃপক্ষের লোক বলেছে? না, তেমন বলেনি। ওই সাইনবোর্ড শুধুমাত্র এটা জানাচ্ছে - কর্তৃপক্ষ চায়, জনগণ যেন ফুল না ছেঁড়ে। এটাকেই আদেশ বলে। আদেশ কোন কথা বা ভাষা নয়। আদেশ হলো কর্তৃপক্ষের পছন্দের ও অপছন্দের কাজের তালিকা।

  • কোরআন হলো আল্লাহর আদেশ। মানুষ কোরআনের আদেশ নিষেধ মেনে চলবে, এটাই আল্লাহর ইচ্ছা। এমন আদেশ দেবার জন্য কোন ভাষা বা কথা লাগে না।

আল্লাহর সেই আদেশ পাঠিয়েছেন, জীবরাইল ফেরেশতার মাধ্যমে, নবী (স) এর কাছে। কখনো কি ভেবে দেখেছেন? - আল্লাহ এমনিতেই সরাসরি মুহাম্মাদ (স) এর কাছে কোরআন পাঠাতে পারতেন। জীবরাইল ফেরেশতার মাধ্যমে কেন পাঠিয়েছেন?

যখন জীবরাইল ফেরেশতা (কোরআনের আয়াত) নিয়ে আসেন, তখন আপনি ওটাকে একটি বার্তা, খবর, মেসেজ, আদেশ, নির্দেশ, তথ্য, ইত্যাদি বিভিন্ন নাম দিতে পারবেন। কিন্তু ওটাকে "কথা" নাম দিতে পারবেন না। সংবাদ বা আদেশ আনা যায়, "কথা" আনা যায় না।

আল্লাহ যদি সরাসরি মুহাম্মাদ (স) এর মস্তিষ্কে কোরআন পাঠাতেন তাহলে হয়তো ওটাকে "কথা" নাম দিতে পারতেন। জীবরাইল ফেরেশতা নিয়ে আসার কারণে, ওটা নিশ্চিতভাবে "বার্তা" হয়ে গেছে। পোস্টম্যান "চিঠি" নিয়ে যায়, "কথা" নিয়ে যায় না। তবুও, আপনারা কেন কোরআনের আয়াতকে আল্লাহর "কথা" মনে করেন?

———- আদর্শ স্কুলের হেড-মাস্টার এর পক্ষ থেকে জানানো যাইতেছে যে, ৭ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত স্কুল বন্ধ থাকিবে————

উপরের এই লেখাটি দেখে আপনি কি মনে করেন যে, হেড-মাস্টার এই কথাগুলো বলেছিলেন? না, আপনি তেমন মনে করেন না। আপনি জানেন, ওটা হেড-মাস্টার এর বার্তা/নির্দেশ। কথা নয়।

———- আমাদের বড় ছেলের সাথে অমুক পরিবারের মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। আগামী ১৭ তারিখে সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি ———

বিয়ের আমন্ত্রণ-পত্রে উপরের এই লেখাটি দেখে, আপনি কি মনে করেন যে, বর এর বাবা এই কথাগুলো বলেছিলেন? না, আপনি তেমন মনে করেন না। আপনি জানেন, ওটা বর এর বাবার আমন্ত্রণ। কথা নয়।

——— কালের শপথ। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তারা ব্যতীত, যারা ইমান এনেছে, সৎকর্ম করে ও পরস্পরকে ন্যায়বিচার ও ধৈর্যর উপদেশ দেয়। (সুরা আসর) ————-

কোরআনের এই লাইন দেখে, এই কথাগুলো আল্লাহ বলেছেন, এমন মনে করেন কেন? আপনি কেন বোঝেন না যে, ওটা আল্লাহর বার্তা/নির্দেশ/আদেশ। কথা নয়।

সারমর্ম: আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতার জন্য বিষয়টা ভুল বুঝি। আল্লাহর ভাষা/কথা ইত্যাদির দরকার হয় না। কোরআন হলো আল্লাহর বার্তা/নির্দেশ/আদেশ (কথা নয়)। পোস্টম্যান এর মতন, এই বার্তা/আদেশ এনেছেন জীবরাইল। শিক্ষকের মতন, এই বার্তা/আদেশ পালন করা শিখিয়েছেন মুহাম্মাদ (স)।

মনে রাখবেন - এতক্ষণ আমি আপনাকে বিভিন্ন বার্তা/তথ্য দিয়েছি। এই বার্তা দেবার জন্য একটিও "কথা" বলতে হয় নি। বার্তা হলেই সেটা "কথা" হয় না।

Comments