ছোটবেলা থেকেই আমরা একটা প্রশ্নের উত্তর শুনে অভ্যস্ত—সবচেয়ে দ্রুতগতির প্রাণী কোনটি? সবারই জানা, উত্তরটি হলো চিতা বাঘ। একটি চিতা বাঘের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার। এই গতি ঠিক কতটা তীব্র, তা বোঝার জন্য ঘোড়ার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ঘোড়ার গতি সাধারণত ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার হয়ে থাকে। আপনি হয়তো কখনো সরাসরি চিতা দৌড়াতে দেখেননি, তবে ঘোড়ার দৌড় ঠিক কেমন তা নিশ্চয়ই জানেন। সেই ঘোড়ার প্রায় দ্বিগুণ বেগে দৌড়ায় চিতা। অবশ্য চিতা এই অবিশ্বাস্য গতি খুব অল্প সময়ের জন্যই ধরে রাখতে পারে, বিশেষ করে যখন এটি শিকারের পেছনে ছোটে। অন্যদিকে, ঘোড়ার রয়েছে দারুণ স্ট্যামিনা বা সহনশীলতা, যা দীর্ঘ সময় ধরে দ্রুত গতিতে দৌড়াতে সাহায্য করে।
তবে পোকামাকড়ের জগতের দিকে তাকালে, এই গতির হিসাব একদম বদলে যায়। খালি চোখে তাদের খুব ধীরগতির মনে হলেও, আসলে তারা আমাদের চেনা যেকোনো প্রাণীর চেয়ে অনেক বেশি দ্রুতগতির।
ছোট একটি হিসাব করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। একটি সাধারণ পিঁপড়ে সাধারণত ৫ মিলিমিটার লম্বা হয় এবং প্রয়োজন পড়লে প্রতি সেকেন্ডে ১৫০ মিলিমিটার পথ দৌড়াতে পারে। অর্থাৎ, মাত্র এক সেকেন্ডে সে তার নিজের শরীরের দৈর্ঘ্যের ৩০ গুণ পথ পার হয়ে যায়! এবার তুলনা করা যাক একটি দ্রুত গতির ল্যাম্বরগিনি গাড়ির সঙ্গে। গাড়িটি লম্বায় প্রায় ৫ মিটার এবং ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার বেগে ছোটে। এর মানে দাঁড়ায়, এটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯০ মিটার পথ যায়, যা গাড়িটির নিজের দৈর্ঘ্যের ১৮ গুণ।
পিঁপড়ে দৌড়ায় নিজের শরীরের দৈর্ঘ্যের ৩০ গুণ।
ল্যাম্বরগিনি ছোটে নিজের দৈর্ঘ্যের ১৮ গুণ।
এর মানে হলো, আপেক্ষিক গতির দিক থেকে পিঁপড়েরা ল্যাম্বরগিনির চেয়ে অনেক এগিয়ে! এমনকি গতির এই খেলায় চিতা বাঘও পিছিয়ে আছে। চিতা প্রতি সেকেন্ডে তার নিজের শরীরের দৈর্ঘ্যের ১৪ গুণ পথ অতিক্রম করতে পারে, যেখানে একটি ল্যাম্বরগিনি সেকেন্ডে তার নিজের দৈর্ঘ্যের ১৮ গুণ দূরত্ব পার করতে সক্ষম।
গল্প এখানেই শেষ নয়। পোকামাকড়ের দুনিয়ায় এর চেয়েও দ্রুতগতির প্রাণী রয়েছে, যা আমাদের আশপাশেই দেখা মেলে। তেলাপোকার কথাই ধরা যাক। একটি গড়পড়তা তেলাপোকার দৈর্ঘ্য ৪ সেন্টিমিটার এবং এরা ঘণ্টায় ৫.৪ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে পারে। সেকেন্ডের হিসেবে এটি প্রায় ১৫০ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ, তেলাপোকা তার নিজের শরীরের দৈর্ঘ্যের প্রায় (১৫০/৪) ৩৭ গুণ পথ পার করে ফেলে । এটি আমাদের সেই পিঁপড়ের গতিকেও ছাড়িয়ে যায়, যারা সেকেন্ডে নিজের দেহের ৩০ গুণ পথ দৌড়াতে পারে।
এর চেয়েও দ্রুতগতির প্রাণীর খোঁজ পেতে চাইলে তাকাতে হবে অস্ট্রেলীয় টাইগার বিটলের দিকে। এই পোকাটি লম্বায় ২ সেন্টিমিটার এবং প্রতি সেকেন্ডে ২৫০ সেন্টিমিটার পথ দৌড়াতে পারে! এর অর্থ হলো, এটি প্রতি সেকেন্ডে নিজের শরীরের দৈর্ঘ্যের ১২৫ গুণ পথ পার হয়ে যায়—যা একটি ল্যাম্বরগিনির গতির চেয়েও ৫ গুণের বেশি দ্রুত!
তবে অস্ট্রেলীয় এই বিটল একসময় সবচেয়ে দ্রুতগতির প্রাণীর বিশ্বরেকর্ড ধরে রেখেছিল, যতক্ষণ না Paratarsotomus macropalpis নামের এক ক্ষুদ্র Mite এর সন্ধান মেলে। Mite হলো উই পোকা বা ঘুন পোকা। ক্যালিফোর্নিয়ার অধিবাসী উই-পোকা ঠিক চালের দানার মতো ছোট—মাত্র ০.৭ মিলিমিটার। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এটি প্রতি সেকেন্ডে ২২৫ মিলিমিটার পর্যন্ত দৌড়াতে পারে! এর ফলে এই ক্ষুদ্র প্রাণীটি প্রতি সেকেন্ডে নিজের শরীরের দৈর্ঘ্যের ৩২০ গুণেরও বেশি পথ অতিক্রম করে ফেলে।
চালের দানার সাইজের এই উই-পোকা, একটি ঘোড়ার চেয়ে ৪০ গুণ, চিতা বাঘের চেয়ে ২৩ গুণ এবং ল্যাম্বরগিনি গাড়ির চেয়েও ১৬ গুণ বেশি গতিশীল। আর এভাবেই এটি পৃথিবীর বুকে আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে দ্রুতগতির প্রাণী।
লিঙ্কঃ https://en.wikipedia.org/wiki/Paratarsotomus_macropalpis

Comments
Post a Comment